রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:১৯ পূর্বাহ্ন

মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের ভূমিকা ও পর্যাপ্ততা

মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের ভূমিকা ও পর্যাপ্ততা

হাবিবুর রহমান হাবিব

ফুলবাড়ী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি

বাংলাদেশে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক প্রান্তিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্য সহকারীরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সেবা প্রদান করছেন।বর্তমানে দেশে ১৩হাজারের বেশি তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে।এসব সেবা কেন্দ্রে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সেবা,প্রজননস্বাস্থ্য,পরিবার পরিকল্পনা সেবা,টিকাদান কর্মসূচী,পুষ্টি,স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরামর্শসহ বিভিন্ন সেবা প্রদান করা হয়।বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ও দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় স্বাস্থ্যখাত ঈর্ষনীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সেবা তরান্বিত করার লক্ষ্যে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে ও সেগুলোর বাস্তবায়নও হচ্ছে।কারন প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা গ্রামে অনেক দরিদ্র ও অসচেতন মানুষ রয়েছে।তাদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা একেবারে কম।সেক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিকে এসব মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক সহযোগিতা রয়েছে।সেবাকেন্দ্র গুলোতে প্রায় ৩০প্রকার ঔষুধ বিনামূল্যে প্রয়োজনমত প্রদান করা হচ্ছে।বর্তমানে গর্ভবতী মায়েদের সন্তান প্রসবের উপকরন তথা প্রশিক্ষিত ও দক্ষ স্বাস্থ্য সেবাকর্মীও আছেন।

 

তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুলোতে স্বাস্থ্যকর্মীরা কতগুলো সেবা খুব সহজেই দিতে পারেন।সেগুলো হলো ডায়রিয়ার ওর স্যালাইন,রক্তচাপ পরিমাপ,ওজন পরিমাপ,সুগার টেস্ট,চোখ সাদা বা ফ্যাকাশে হয়ে গেলে আয়রন ট্যাবলেট,সাধারণ জ্বর,মাথাব্যাথা,গর্ভবতী মায়েদের ফলিক অ্যাসিড,কৃমিনাশক ট্যাবলেট ও অন্যান্য।তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো গ্রামের একজন নারীকে সন্তান প্রসবের জন্য প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের বিপদ ও অদক্ষ দাইয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।বর্তমান সময় উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে শতভাগ বিদ্যুৎ সংযোগ বা সৌর বিদ্যুৎ সহ কিছু স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র দোতালায় পরিনত হয়েছে।তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন ও সেবা প্রদান আরও তরান্বিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য ট্রাস্ট ফান্ড তৈরির।এ ফান্ডে সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থ দেবে।এরপর কমিউনিটির মধ্য থেকেই ফান্ড তৈরি হতে থাকবে।তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের এমন কাঠামো থাকবে,যাতে এটি কোনদিন শেষ না হয়।

 

কাশিপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মোঃমোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন,কমিউনিটি বা তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে গ্রামের দরিদ্র মানুষের অনেক ধরনের সেবা দেওয়া হয়।বিশেষ করে মা ও শিশুরা এখান থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সেবা পেয়ে থাকে।মায়েদের গুরুত্বপূর্ণ দু’টি সেবা হলো গর্ভ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সেবা।সেই সেবার জন্য গ্রামাঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিকের বিকল্প নাই।কোন কোন ক্লিনিকে প্রসবের ব্যবস্থাও আছে।আমাদের গর্ভ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সেবার হার বেড়েছে।এছাড়াও ৬০শতাংশের বেশি প্রসব বাড়িতেই হয়।

গত ২২আগষ্ট সফল ক্লিনিক পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।পাশাপাশি সেবা কর্মীদের ই-লার্নিংয়ের উদ্ভোধন হলো।এটা অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।এতে আমাদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেকগুনে।বর্তমান সেবা কেন্দ্রগুলোতে গড়ে ৫০-৬০জন রোগি নিয়মিত আসে।সেই তুলনায় আমাদের রুম সংকট হয়।একই সাথে প্রয়োজনীয় ঔষুধপত্র চাহিদার তুলনায় আরও বৃদ্ধি করা দরকার। একজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার হিসেবে মনেকরি সব ক্লিনিকগুলোতে সমান উপকরন,কিছু লোকবল বৃদ্ধি ও সেবা প্রদানের যথার্থতা থাকলে এবং তা কাজে লাগাতে পারলে গ্রামীন স্বাস্থ্য সেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

 

কাশিপুর ইউনিয়নের ধর্মপুর গ্রামের আছমা বেগম বলেন,বর্তমান ক্লিনিকে নিয়মিত ঔষুধ নিতে পারছি।জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও দিচ্ছে ডাক্তার আপারা।নিজের প্রেসার,ডায়াবেটিস ও ওজন নিয়মিত ক্লিনিকে গিয়ে জানতে পারছি।তবে,একদিনে আমরা যত রোগী সেবা নিতে যাই সে তুলনায় আরও যদি ডাক্তার বা স্বাস্থ্যসেবা কর্মী বাড়ানো যেত তখন আরও চাহিদামত সকলেই সেবা নিতে পারতো।

 

অন্যদিকে অনন্তপুর এলাকার মাহমুদা বেগম জানান,”হামরা আর হামার বাড়িওয়ালা কাজ-কামাই করি খাওয়া মানুষ।মন চাইলে দূরত যায়া চিকিৎসা নিবার পাই না।ক্লিনিকগুল্যাত কিছু বড়ি-টরি পাই।কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ করি কাজ-কামাই করবের ধরি হাড্ডি ভাঙ্গি গেইলে,কিছু বড় কাটা গেইলে,স্যানাইল দিবার দরকার হইলে যেন ক্লিনিকতে চিকিৎসা নিবার পাই হামার সরকার সেগল্যা করুক।তখন হামার গুল্যার মত গরীব-অসহায় মানুষ চিকিৎসার জন্যে অনেক উপকার পামো।”

 

ফুলবাড়ী উপজেলার স্বাস্থ্য পরিদর্শক(ইনচার্জ) মোঃজহুরুল হক জানান,প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছাতে প্রতি সাপ্তাহে কেন্দ্রগুলোতে একজন ভিজিটর বা এফডাব্লিউভি’র উপস্থিতি নিশ্চিত করা।একই সাথে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে নূন্যতম প্রতি মাসে নিয়মানুযায়ী একজন এমবিবিএস ডাক্তারের সেবা ও পরামর্শ প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনেকরি।

 

ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃসুমন কান্তি সাহা বলেন,স্বাস্থ্য সেবায় কমিউনিটি ক্লিনিক একটি বিল্পবী উদ্যোগ।প্রান্তিক পর্যায়ে নানামুখী সেবার চাহিদা অনুযায়ী সেবা প্রদানে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে লোকবল,লজিস্টিক সাপোর্ট,ভবন নির্মাণ ও ঔষুধ প্রদানের পরিমান বৃদ্ধি একান্ত জরুরী।অন্যথায় আমাদের হেলথ প্রোভাইডারগন,স্বাস্থ্যকর্মীগণ সেবা প্রদানের চাহিদা মেটাতে অনেকটা হিমশিম খায়। দেশের সকল তৃণমূল স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র বা ক্লিনিকগুলো যেন গ্রামের বা তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র থেকে সকল শ্রেণির মানুষকে মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারে,এ জন্য সরকার,উন্নয়ন সহযোগি প্রতিষ্ঠান,কমিউনিটি গ্রুপ ও সাপোর্ট গ্রুপসহ সংশ্লিষ্ট সবাই আরও উদ্যোগী হবেন বলে আশাকরি।

আপনার স্যোসাল মাধ্যমে শেয়ার দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2022 teestasangbad.com
Developed BY Rafi It Solution